বেনাপোলে আমদানি-রফতানি বন্ধের শঙ্কা

 

যশোর প্রতিনিধি

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে লকডাউনের মধ্যেই পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে রফতানির কাজ শুরু করলেও ফের তা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

রোববার সকালে ভারতের বনগাঁর ছয়ঘরিয়া পঞ্চায়েতের পেট্রাপোল সীমান্ত লাগোয়া জয়ন্তীপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাসহ এই স্থলবন্দরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের শতাধিক শ্রমিক এদিন যশোর রোড অবরোধ করে বিােভ করেন।

তাদের দাবি সীমান্তের ওপারে বেনাপোলেও বহু মানুষ করোনা সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে সংবাদ মাধ্যমে। এ অবস্থায় ওপার বাংলার শ্রমিকরা এপার বাংলার কাজে যুক্ত থাকলে দ্রুত সংক্রমণ ছড়াবে সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোতেও। তাই রফতানি হোক বা আমদানি কাজ শুরু হলে করোনা সংক্রমণ কোনোভাবেই ঠেকানো যাবে না। ফলে এলাকাবাসীর স্বার্থে বন্ধ রাখতে হবে আর্ন্তাতিক সীমান্ত বাণিজ্য।

এদিকে বিােভের খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসনিক আধিকারিকরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলে বিােভ তুলে নেন গ্রামবাসীরা।

একদিকে বাণিজ্য করিডর খোলার নির্দেশ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। অন্যদিকে সীমান্তে শিথিলতা দেখাতে রাজি নয় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সীমান্তের সমন্ত বাণিজ্য করিডোর দিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অত্যাবশ্যক পণ্য চলাচল শুরুর নির্দেশ দিলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

দফায় দফায় আমদানি-রফতানি চালুর বিষয়ে আলোচনা করা হলেও রাজ্য সরকার থেকে কোনো সুফল বার্তা না পাওয়ায় চালু করা যাচ্ছে না আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। ২৩ মার্চ থেকে ভারতে লকডাউনের কারণে এ পথে আমদানি-রফতানি বন্ধ করে দেয়া যায়।

পেট্রাপোল বন্দর এবং সংলগ্ন এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার ট্রাক পণ্য নিয়ে আটকে রয়েছে। ভারতীয় রফতানিকারীরা চাইছেন, অন্তত ওই ট্রাকগুলো বাংলাদেশে পাঠানো হোক।

গত ২৪ এপ্রিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব অজয় ভাল্লা রাজ্যের মুখ্যসচিব রাজীব সিংহকে চিঠি লিখে জানিয়েছেন, নেপাল, ভুটানগামী অত্যাবশকীয় পণ্য আটকে রাখার ফলে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন হচ্ছে। কোনো রাজ্য একতরফা সীমান্ত বন্ধ করতে পারে না। তাই বাণিজ্য করিডরগুলো জ্বালানি, এলপিজি, খাদ্য সামগ্রী, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম পরিবহনের জন্য খুলে দেয়া হোক। বাংলাদেশ সীমান্তের যে কটি করিডোর দিয়ে পণ্য পরিবহন হয়, সেগুলো খুলতে বলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান সীমান্তে বাণিজ্য করিডোর খুললে উত্তরবঙ্গ ও দণিবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না। ফলে সীমান্তে শিথিলতা দেখাতে রাজি নয় রাজ্য।

মুখ্যমন্ত্রী রাজ্য পুলিশের ডিজি বীরেন্দ্র এবং নিরাপত্তা অধিকর্তা সুরজিৎ কর পুরকায়স্থকে পেট্রাপোল, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও শিলিগুড়ির সীমান্ত পরিস্থিতি খোঁজ করতে পাঠিয়েছিলেন। তাদের রিপোর্টেও এখনই অবাধ বাণিজ্য চালু না-করার কথা বলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় রফতানিকারকরা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখলেও লকডাউনের শুরু থেকেই পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যত বন্ধ। কেন্দ্রের লকডাউন নির্দেশিকায় সীমান্ত দিয়ে অত্যাবশক পণ্যের যাতায়াত চালু রাখার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে তা কার্যত বন্ধ।

ওপারের সূত্র জানায়, লকডাউন শুরু হতেই রাজ্যের বাইরে থেকে পণ্য নিয়ে আসা ট্রাক পেট্রাপোল থেকে দ্রুত ফিরিয়ে দিয়েছিল পুলিশ প্রশাসন। এখন আটকে থাকা পণ্য ভর্তি ট্রাকের রফতানিকারীরা প্রায় সকলেই স্থানীয়। রাজ্যের বাইরের রফতানিকারী সংখ্যায় কম।

অভিযোগ, বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট মহল লকডাউনের মধ্যে বাণিজ্যের কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন ও রাজনৈতিক হস্তেেপ তা সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীদের বন্ধ রাখতে বলা হয় বেসরকারিভাবে। কোনো লিখিত নির্দেশ দেয়া হয়নি।

প্রশাসনেরও পাল্টা যুক্তি ছিল। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, বাংলাদেশের জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। বাণিজ্য চালু থাকলে এ দেশের ট্রাক চালকদের বাংলাদেশে পণ্য খালি করতে গিয়ে কয়েকদিন থাকতে হবে। কোনোভাবে ওই চালক সংক্রমিত হলে এলাকায় তা ছড়িয়ে পড়বে। তাই বিষয়টির গুরুত্ব উড়িয়ে দেয়া যায় না। এলাকার মানুষও সরকারে এ যুক্তিকে সমর্থন করেছেন।

প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ট্রাকচালক বাংলাদেশে গেলে, তারপর ফিরে আসলে তাকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রে থাকতে হবে। এ বিষয়টা মাথায় রেখে কিভাবে পণ্য রফতানি শুরু করা যায় তা নিয়ে আলোচনা চলে।

পেট্রাপোল কিয়ারিং এজেন্ট স্টাফ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক কার্তিক চক্রবর্তী বলেন, আটকে থাকা ট্রাকগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০০টি ট্রাকে অত্যাবশ্যক পণ্য রয়েছে বলে কেন্দ্রের দেয়া তালিকা থেকে জানতে পেরেছি। বৈঠকে প্রস্তাব দিয়েছি, অত্যাবশ্যক পণ্য নিয়ে ট্রাক চালকেরা যাবতীয় সুরা নিয়ে বেনাপোল যাক। দিনে দিনে সেখানে পণ্য খালি করে চলে আসুক। চালকেরা ফিরে এলে তাদের যেন ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো না হয়।

পেট্রাপোল এক্সপোর্টার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পরিতোষ বিশ্বাস বলেন, আটকে থাকা ট্রাকের মধ্যে মালপত্র নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিন ট্রাক আটকে থাকায় ট্রাকগুলোও তিগ্রস্ত হচ্ছে। এখনই ট্রাকগুলো বেনাপোলে পাঠাতে না পারলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা পরবর্তী সময়ে তা নিতে অস্বীকার করতে পারেন। তাছাড়া পার্কিং-এ ট্রাক থাকায় রোজ ট্রাক প্রতি পার্কিং ফি বাবদ ১৪০০-১৫০০ টাকা করে রফতানিকারীদের দিতে হবে। ফলে আর্থিকভাবে আমরা তিগ্রস্ত হচ্ছি। সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এ দেশের ট্রাক থেকে বাংলাদেশের ট্রাকে পণ্য তুলে নেয়া হোক।

পরিতোষ বিশ্বাস বলেন, প্রশাসনের কাছে আমরা আবেদন করেছি, যাবতীয় সুরা বজায় রেখে আটকে থাকা ট্রাকগুলোকে পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে যেতে দেয়া হোক। যদিও জিরো পয়েন্টে পণ্য উঠানো-নামানো কাজের পরিকাঠামো কতটা রয়েছে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট মহল।

এদিকে ২৮ এপ্রিল পেট্রাপোল বন্দর দিয়ে অত্যাবশ্যক পণ্য রফতানির কাজ শুরু করতে পেট্রাপোলে বৈঠক করেন উত্তর ২৪ পরগণা জেলার জেলাশাসক চৈতালি চক্রবর্তী, বনগাঁর পুলিশ সুপার তরুণ হালদার, রাজ্য সরকার নিযুক্ত উত্তর ২৪ পরগণা জেলার নোডাল অফিসার সঞ্জয় কুমার থাড়ে, বনগাঁর মহকুমাশাসক কাকলি মুখোপাধ্যায়।

ছিলেন শুল্ক দফতর ও বিএসএফের কর্তারা। বৈঠকে ডাকা হয়েছিল কিয়ারিং এজেন্ট সংগঠনের প্রতিনিধি এবং পণ্য রফতানি ও আমদানিকারী সংগঠনের প্রতিনিধিদেরও। বৈঠকে আটকে থাকা পণ্য কিভাবে দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠকে আলোচিত সমন্ত প্রস্তাব উর্ধ্বতন কর্তৃপকে জানানো হবে। তারপরে দু’দেশের মধ্যে আলোচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, কিভাবে বাণিজ্যের কাজ শুরু করা যায়, তা নিয়ে এদিন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিষয়টিও এ েেত্র গুরুত্বপূর্ণ।